scorecardresearch

বড় খবর

লাগাতার অবরুদ্ধ সড়ক-রেল, কী কারণে এত বড় আন্দোলনে কুড়মি সমাজ?

সরকার তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ কুড়মি সমাজের।

লাগাতার অবরুদ্ধ সড়ক-রেল, কী কারণে এত বড় আন্দোলনে কুড়মি সমাজ?
দাবি আদায়ে লাগাতার আন্দোলনে কুড়মি সমাজ।

১৮৭১ সাল অর্থাৎ ইংরেজ আমল থেকেই তৎকালীন ভাষা অনুযায়ী কুড়মি সম্প্রদায় তফসিলি জাতিভুক্ত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোনও ‘জাদু বলে’ তালিকা থেকে বাদ চলে যায় কুড়মিরা। এমনই দাবি করে আন্দোলনকারীদের হুঁশিয়ারি, তফসিলি জনজাতির অন্তর্ভুক্ত না করা পর্যন্ত গুলি করলেও তাঁরা রেল ও সড়ক অবরোধ তুলবে না। প্রশাসন গুলি করলে হাজার মানুষ গুলি খাবে। সরকার তাঁদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলেও তাঁদের অভিযোগ।

কী কারণে আজ তাঁদের লাগাতার অবরোধে সামিল হতে হল সেকথা বিস্তারিত ভাবে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলাকে জানিয়েছেন আদিবাসী কুড়মি সমাজ বাঁকুড়া জেলা কমিটির জয়েন্ট সেক্রেটারি বীরেন্দ্রনাথ মাহাতো। কি বলছেন তিনি?

ইংরেজ আমলের ইতিহাসঃ

১৮৭১ সালে ব্রিটিশ সরকার জনগণনা শুরু করে। তখন কুড়মিদের বলা হয় ঝাড়ি কুড়মি। অর্থাৎ এরা ঝোপ ঝাড়ে থাকে। ওরা যেমন উপলব্ধি করেছিল তেমন তাঁদের ভাষা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। পরবর্তী সেনসাসে বলা হয় এবরজিনাল ট্রাইব (eborginal tribe)। তারপরের সেনসাসে বলা হয় প্রিমিটিভ ট্রাইব (Primitive tribe)। ১৯৩১-এও বলা হয় প্রিমিটিভ ট্রাইব। বিশ্বযুদ্ধের কারণে পরবর্তী জনগণনা হয়নি। ১৯৪১-এ প্রিমিটিভ ট্রাইব হিসাবেই গণ্য হয় কুড়মিরা। অর্থাৎ আগের সেনসাসকেই মান্যতা দেওয়া হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালের ঘটনাঃ

এরপর ১৯৫০-এ এসআরও ৫১০ প্রথম তফসিলি উপজাতির তালিকা প্রকাশিত হয়। তখন কেন্দ্রে মনোনীত সরকার ছিল। সাংসদ হৃদয়নারায়ণ প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর কাছে জানতে চেয়েছিলেন কোন কোন কমিউনিটিকে সিডিউল ট্রাইবের তালিকায় রাখা হবে। তার জবাবে নেহরু জানিয়েছিলেন, ১৯৩১-এর জনগণনায় প্রিমিটিভ ট্রাইব ছিলেন তাঁরাই স্বাধীন ভারতে এসটি তালিকাভুক্ত হবে। সেই অনুযায়ী তালিকায় থাকার কথা ছিল কুড়মিদের। কিন্তু কি কারণে কুড়মি সমাজকে ওই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল তা জানা যায়নি। এখনও সেই কারণ অজ্ঞাত। বাদ দেওয়ার নোটিফিকেশনও হয়নি, অথচ সংযোজনের নোটিফিকেশন আছে। তখন পড়াশুনা জানত না বলে সচেতন ছিল না কুড়মিরা।

আরও পড়ুন- গরু পাচার মামলায় জেলবন্দি এনামুলকে জেরা, আদালতে আবেদন CID-এর

ওবিসি হওয়ার ইতিহাসঃ

মণ্ডল কমিশনের সময় বাঁকুড়ার রানিবাঁধের দেউলি গ্রামের কুম্ভপ্রসাদ মহারাজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওবিসি তালিকাভুক্ত হয় কুড়মিরা। এই জনজাতি পিছিয়ে পড়ে রয়েছে বলে তিনি ওবিসি তালিকাভুক্ত করেছেন। এই সমাজের মানুষ তাঁকে উপাধি দিয়েছিলেন। একসময়ের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বুটা সিংয়ে সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সখ্যতা ছিল। উনি তৎকালীন সমাজে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পিছিয়ে পড়া কুড়মি সমাজের জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন। তবে তাঁর কাছেও এত তথ্য ছিল না।

এসটি অন্তর্ভুক্তির আন্দোলনঃ

তারপর তথ্য জানার পর ফের প্রচেষ্টা হয় কুড়মিদের এসটি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার। ব্লক স্তর থেকে আন্দোলন চলেছে। পথে নেমে আন্দোলন করেছে। আবেদন নিবেদন করেছে সরকারের কাছে। এসটিতে নিয়ে আসার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রোপোজাল পাঠিয়েছিল রাজ্য সরকার। সিআরআই(Cultural Research Institute) সমীক্ষা রিপোর্ট পাঠিয়েছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ফার্দার জাস্টিফিকেশন ও কমেন্ট জানার জন্য রাজ্যের কাছে পাঠায় ২০১৭ সালে। কিন্তু সিআরআই সেই রিপোর্ট আজ ২০২২ সাল হলেও পাঠায়নি। যতবার জানতে চাওয়া হয়েছে রাজ্য সরকার বলেছে রিপোর্ট পাঠাচ্ছি।

আরও পড়ুন- পুজোর মুখেও দুর্যোগের আশঙ্কা? বিরাট আপডেট হাওয়া অফিসের

শুক্রবার অবরোধ চার দিনে পড়েছে। বীরেন্দ্রনাথ মাহাত বলেন, ‘রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জাস্টিফিকেশন ও কমেন্টের সেই রিপোর্ট গত ৫ বছর ধরে পাঠাচ্ছে না বলেই টানা অবরোধ জারি রেখেছে কুড়মি সামাজ। রিপোর্ট পাঠাচ্ছি বলে সরকার আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে।’ কুড়মি নেতৃত্ব স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়েছে, সমস্যার সমাধান না করে বলপ্রয়োগ বা গুলি চালালেও তাঁরা এক পা-ও পিছপা হবেন না। অবরোধও উঠবে না।’

এরাজ্যে পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া মূলত এই চার জেলায় কুড়মিদের বসবাস। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, রাজ্যে কুড়মি সমাজের জনসংখ্যা ৬৬ লক্ষ। কেন দীর্ঘ দিন পেরিয়ে এখন অবরোধে নামতে হল? বীরেন্দ্রনাথ মাহাতর বক্তব্য, ‘ছোটনাগপুর এলাকায় তৎকালীন কুড়মি জনজাতি-সহ অন্যরা উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। ১০০ বছর আগে কুড়মি জনজাতির কোনও পড়ালেখা ছিল না। এরপর নতুন প্রজন্ম সেই সমস্ত ইতিহাসের তথ্য আজ পড়াশোনার সুবাদে জেনে এই জায়গায় উপনিত হয়েছে। সচেতনতার সঙ্গে কুড়মি সমাজ উপলব্ধি করে সরকার আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তারপরেই তামাম ছোটনাগপুর এলাকায় এই জনজোয়ার। তিন দিনে একটা পয়েন্ট খেমাশুলিতে ১ লক্ষ লোকের হাজিরা পার করেছে। বৃহস্পতিবার রাতেও ৪০ হাজার লোক ছিল।’

আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, রাজ্য সরকার রিপোর্ট পাঠানোর পর কেন্দ্রীয় সরকার প্রাপ্তি স্বীকার করবে। কুড়মিদের জনজাতি তালিকাভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা নেওয়া হলে তাঁরাও অবরোধ তুলবেন।

Stay updated with the latest news headlines and all the latest Westbengal news download Indian Express Bengali App.

Web Title: Kurmis warned to continue the siege until their demands are met