/indian-express-bangla/media/media_files/2025/08/01/meena-2025-08-01-10-22-00.jpg)
এই অভিনেত্রীর ভয়ঙ্কর জীবন...
অভিনয় জগতে শিশুদের প্রবেশ, বিশেষ করে খুব অল্প বয়সেই ক্যামেরার মুখোমুখি হওয়া, এক ধরনের অন্তঃস্থ ট্র্যাজেডির সৃষ্টি করে। যখন শিশুরা বর্ণমালাও পড়তে শেখেনি, তখনই তারা সংলাপ মুখস্থ করে নেয়। বন্ধুত্বের সহজ আবেগ গড়ে ওঠার আগেই তাদের পেশাদার হতে শেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মা, সন্তানদের কর্মচারীর মতো ব্যবহার করেন। যাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, তারাই শিশুদের ঠেলে দেন এমন পরিবেশে যা প্রায়শই অনিরাপদ ও সংবেদনহীন।
এই বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে বিভিন্ন তথ্যচিত্রে- Finding Neverland, Quiet on Set: The Dark Side of Kids’ TV- যেখানে তুলে ধরা হয়েছে কীভাবে কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানদের শৈশবের বিনিময়ে অর্থ, খ্যাতি বা কেবল সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত করেছেন।
Guess who: সাদা চুলের আড়ালে কোঁকড়ানো চামড়া, এই অভিনেতার জোরাল দৃষ্টি সবকিছু থমকে দেবে..
ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে- ডেইজি ইরানি, রেখা, মধুবালা কিংবা 'ট্র্যাজেডি কুইন' খ্যাত মীনা কুমারীর মতো শিল্পীরা খুব অল্প বয়সে ফিল্ম সেটে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কষ্ট উপেক্ষিত থেকেছে ইন্ডাস্ট্রির বুকে। কারণ তাদের জন্য সিনেমা শুধু ক্যারিয়ার নয়, পরিবারের অর্থনৈতিক স্তম্ভ হয়ে উঠেছিল।
মীনা কুমারীর একটি নির্মম শৈশব
১৯৩৩ সালে মুম্বাইয়ের দাদরের একটি ছোট চাল ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন মাহজাবীন বেগম। যিনি পরবর্তীতে মীনা কুমারী নামে পরিচিত হন। মাত্র চার বছর বয়সে তাকে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানো হয়। তাঁর বড় বোন খুরশিদ তখন ইতিমধ্যেই শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। তাদের বাবা, আলী বক্স ছিলেন এক ব্যর্থ সংগীতশিল্পী, যিনি পাকিস্তান থেকে চলে এসে ভারতের মাটিতে নতুন শুরু করছিলেন। তার জীবনের অবলম্বন হয়ে উঠেছিল তাঁর তিন মেয়ে- খুরশিদ, মাহজাবীন (মীনা) এবং মধু। ইকবাল বেগম, যিনি পূর্বে হিন্দু ছিলেন এবং ঠাকুর পরিবারের একজন ছিলেন, তিনিই ছিলেন তাদের মা।
Soumitra Chatterjee: ক্যামেরার সামনে হাঁটতে শিখিয়েছেন, তপন সিংহর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের কোন মিল পেয়েছিলেন সৌমিত্র?
কথিত আছে, মীনার জন্মের সময় আলী বক্স এতটাই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন যে তাকে অনাথ আশ্রমের বাইরে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যদিও এই গুজব সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি, তবে পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা ছিল নির্মম, ছোট মীনাকে তার শৈশব ছাড়াই বেড়ে উঠতে হয়। মীনার নিজের ভাষায়- বিনোদ মেহতার লেখা, Meena Kumari: The Classic Biography বইয়ে তিনি বলেন, "যেদিন প্রথম কাজে গিয়েছিলাম, বুঝিনি যে আমি শৈশবের আনন্দকে বিদায় জানাচ্ছি। আমি ভেবেছিলাম কয়েকদিন কাজ করব, তারপর স্কুলে যাব। কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি।"
পারিবারিক দায়িত্বের জালে আটকে যাওয়া জীবন
মীনার শৈশব কখনই সাধারণ কোনও গল্প ছিল না। লেদার ফেস নামক ছবির মাধ্যমে সিনেমায় তার যাত্রা শুরু। পারিশ্রমিক ছিল মাত্র ২৫ টাকা। কিন্তু এটাই হয়ে উঠল পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। ৬-৭ বছর বয়স থেকেই তাকে নানা স্টুডিওতে ঘুরতে হত, কাজ করেই পরিবারের খরচ চালাতে হত। মেহতার কথায়, "তাঁকে দেখলে মনে হত, তিনি হয়তো খাবার খাওয়ার টিকিট। সমানে কাজ করে যাচ্ছেন।"
১৫ বছরের কম বয়সে তিন বোন এত অর্থ উপার্জন করেছিলেন যে তাদের পরিবার চালঘর ছেড়ে বান্দ্রার একটি ভাল বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। তাদের মা ইকবাল বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে তার নৃত্যজীবন শেষ হয় এবং আলী বক্সও সংগীতকে বিদায় জানান। এরপর পুরো পরিবার নির্ভর করে কেবলমাত্র মেয়েদের উপার্জনের উপর।
Mahalaya 2025: বাংলার সবথেকে প্রিয় দুর্গা কে? ChatGPt-যা উত্তর দিল, শুনলে চমকে যাবেন..
স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সংগ্রাম
যদিও প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মীনা প্রধান অভিনেত্রী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন, কিন্তু প্রকৃত স্বাধীনতা তার কপালে ছিল না। তিনি যখন চুপিসারে কামাল আমরোহিকে বিয়ে করেন, বাবার অনুমতি ছাড়াই, তখন শুরু হয় আরেক অধ্যায়। তিনি জানতেন আলী বক্স তা মেনে নেবেন না। তাই তিনি দুই লক্ষ টাকা সঞ্চয়ের পর সেই সিদ্ধান্ত জানান। কিন্তু নিজের বাড়ি ছাড়ার দিন, মীনা জানান, কামালের সঙ্গে কাজ করতে চান, তখন আলী তার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন। মীনা বাবাকে শেষবার চিঠি লেখেন, "বাবুজি, যা-ই হোক না কেন আমি চলে এসেছি। কিন্তু, আমি শুধু আমার পোশাক আর বইগুলো চাই। গাড়িটা আমি কাল পাঠিয়ে দেব।"
একজন শিল্পীর চিরকালীন ট্র্যাজেডি
মীনার শৈশব থেকে শুরু হওয়া দুঃখের কাহিনি কখনই তাকে ছেড়ে যায়নি। তার জীবনের ছায়ার মতো থেকে গিয়েছে সেই শৈশবের ক্ষত, পরিবারের কাছ থেকে স্বাধীনতা চেয়েছিলেন তিনি এবং নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার ইচ্ছে ছিল তাঁর। আলী বক্স তাকে এমন এক জগতে ঠেলে দিয়েছিলেন, যা তাকে শিল্পী বানালেও মানুষ হিসেবে নিঃস্ব করে দিয়েছিল। মীনা কুমারী শুধুমাত্র এক অসামান্য অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক সমগ্র প্রজন্মের প্রতিবিম্ব, যারা শৈশব বিসর্জন দিয়ে শিল্প ও পরিবারকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। নিজের চাওয়া-পাওয়াগুলোকে নীরবতায় লুকিয়ে রেখে।