বড় খবর

EXCLUSIVE: ক্লাবের গাফিলতি, সংঘাতেই আইএসএলে কোচিং করানো হল না! আক্ষেপ আলেহান্দ্রোর

কলকাতা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে স্পেনের ছোট শহরে। তবু ডার্বির উত্তাপ ছুঁয়ে যাচ্ছে আলেহান্দ্রোকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলাকে দিলেন একান্ত সাক্ষাৎকার।

কত আশা, স্বপ্ন নিয়ে পা রেখেছিলেন তিলোত্তমায়! লাখো লাখো ফুটবল ভক্তের হৃদয়ের সম্রাট হয়ে উঠেছিলেন অচিরেই। তবে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই কলকাতা ছাড়তে হয়। আলেহান্দ্রো মেনেন্ডেজ গার্সিয়া এখনও গিজন শহরে বসে অপেক্ষা নিয়ে, ভারতীয় ফুটবলে ফের ডাক আসবে। ২৭ তারিখ ঐতিহাসিক মহারণ। আইএসএল প্রাঙ্গণে প্রথমবার মুখোমুখি এটিকে-মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল। লাল হলুদ ব্রিগেডের নামের আগে যুক্ত হয়েছে ‘এসসি’ শব্দবন্ধনী। মেরিনার্সদের সংযোজন ঘটেছে ‘এটিকে’-র।

ভারতীয় ফুটবলে শুক্রবারের এল ক্ল্যাসিকোর আঁচ নিজের শহরে বসেই টের পাচ্ছেন ইস্টবেঙ্গলের গত বছরের হেডমাস্টার। আবেগের উত্তাপ মেখে আলেহান্দ্রো ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা-কে স্পেন থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে বলে দিলেন, “আইএসএলের প্রত্যেক ম্যাচ দেখছি। প্রত্যেক ম্যাচেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হচ্ছে। ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখা আমার এখনও প্রথম প্রায়োরিটি। আর ডার্বি তো বরাবরই স্পেশ্যাল। সবসময়েই ডার্বি মানেই আলাদা উত্তেজনা।”

আরো পড়ুন: হাবাসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ইস্টবেঙ্গল কোচের! শতবর্ষের আবহেই চমক ময়দানে

মরিনহোর সহকারী আলেহান্দ্রো

এখনও মনে রেখেছেন নিজের প্রথম ডার্বি। খেই ধরিয়ে দেওয়ার আগেই লাল হলুদের একসময়ে হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা বলে যাচ্ছিলেন, “ইস্টবেঙ্গলের হয়ে প্রথম ডার্বিটাই আমার কেরিয়ারের সেরা। সেই সময় ইস্টবেঙ্গল বহুদিন ডার্বিতে মোহনবাগানকে হারাতে পারছিল না। আমরা ম্যাচের আগে অনুশীলনে অনেক পরিশ্রম করেছিলাম। ম্যাচে অল্প ব্যবধানে আমরা জিতি। সমর্থকরা অনেক আশা নিয়ে গ্যালারি ভরিয়ে তুলেছিল। তারপর সারাক্ষণ ওঁরা উৎসাহ জুগিয়ে গিয়েছে। ম্যাচের পর প্রত্যেকে আমাকে ছুঁতে চাইছিল। সেই তৃপ্তির হাসি, আবেগ, ফুটবলারদের আলিঙ্গন- চারিদিকে উৎসবের আবহ। ওই ডার্বি এখনও আমার কাছে আলাদা।”

আরও পড়ুন শতবর্ষের আমন্ত্রণে সাড়া দিলেন না অভিমানী কিংবদন্তি! শুরুর দিনেই তাল কাটল

শুধু ডার্বি কিংবা ইস্টবেঙ্গল নয়, কলকাতার প্রেমিক হয়ে উঠেছিলেন মধ্য পঞ্চাশের স্প্যানিশ আলেহান্দ্রো। বিদেশি প্রেমিকের হৃদয়ে এখনো অফুরান ভালোবাসা জমানো শহরের জন্য। “কলকাতা ব্যক্তিগতভাবে আমার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ করেছে। কখনই মনে হয়নি, এই শহরে আমি নতুন। যতদিন থেকেছি, ভালোবাসা ছুঁয়ে থেকেছে আমাকে, চারদিকের ভালোবাসা- ক্লাব, সমর্থক, ফুটবল! সমর্থকরা আমাকে ঘরের অনুভব এনে দিয়েছে প্রতি মুহূর্তে। মনে হয়েছে, দীর্ঘদিন এখানেই থেকে যেতে পারি যেন! এতদিন হয়ে গেল, এখন স্পেনে থাকার সময়েও প্রতিদিন আমার মেসেজ বক্সে ভিড় জমায় সমর্থকদের বার্তা। আমি ওদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। যদিও শেষটা মনের মত হল না।”

আরো পড়ুন: শতবর্ষে নতুন অতিথি! আসিয়ান জয়ের নায়ককে বরণ করবে ইস্টবেঙ্গল

সেরা কোচের তকমা

এত ভালোবাসা নিয়েও হতাশা ঘিরে ধরে স্প্যানিশ মায়েস্ত্রোকে। ইস্টবেঙ্গল, কলকাতা- দুই শব্দ মনে পড়লেই যেন ভিড় করে অনন্ত আক্ষেপ। মরিনহোর প্রাক্তন সহকারী হৃদয় উজাড় করে বলছিলেন, “যখন আমি ইস্টবেঙ্গল যোগ দি-ই, সেই সময়েই আইএসএলে খেলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ম্যানেজমেন্টের শিথিলতার কারণে সেই বছরে আইএসএল খেলা হল না। তারপরের বছর ক্লাবের অন্দরেই একাধিক সংঘাত সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। আমি সবসময়েই চেষ্টা করে গিয়েছি ক্লাবে যাতে পেশাদারিত্ব আসে। আমার নিজস্ব ফুটবল দর্শন হল, প্রত্যেক ম্যাচ জেতার পথে না গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে একটা নির্দিষ্ট স্টাইলে, আঙ্গিকে ফুটবলারদের রপ্ত করা। তারপরে আইএসএলে রাজত্ব করা।”

কলকাতা প্রেমী আলে স্যার

গড়গড়িয়ে তিনি বলে যেতেই থাকেন, “আমার কোচিংয়ে জবি জাস্টিন, রালতে, মেহতাব, কামাল সহ তরুণ ফুটবলাররা দ্রুত উঠে আসছিল। ওরা এখন হয়ত অন্য দলের সম্পদ। তবে সেই সময়ে ক্লাবের সমস্যা সাংঘাতিক হয়ে ওঠে। যে পরিস্থতিতে আর কাজ করা যাচ্ছিল না। সেই সময়েই জানতে পারি, কোয়েস বিনিয়োগকারী আর থাকবে না। তাই দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।”

আরো পড়ুন: কাঁধে ইঞ্জেকশন নিয়ে ইস্টবেঙ্গলকে ‘ঐতিহাসিক উপহার’! শতবর্ষে ক্লাবই ভুলল সেই নায়ককে

ইস্টবেঙ্গল ছাড়ার পরে একাধিক প্রস্তাব পেয়েছিলেন। শোনা যায় নর্থ ইস্ট ইউনাইটেড নাকি স্প্যানিশ কোচকে প্রস্তাব দেয়। আলেহান্দ্রো অবশ্য নিজের দর্শন বিসর্জন দিয়ে কোচিংয়ে আগ্রহী নন। ঠেকে শিখেছেন যে কলকাতায় এসে! নিজেই জানালেন, “এমন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই, যাদের প্রতি ম্যাচ জেতা নয়, পাখির চোখ থাকবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়। আমি স্পেনে সেল্টা ভিগো, স্পোর্টিং গ্রিজন, রিয়াল মাদ্রিদের মত বড় ক্লাবে কোচিং করিয়েছি। সেখানের ভাবনাই হল, তাৎক্ষণিক ফলাফলের পিছনে না ছুটে ভবিষ্যতের ক্ষেত্র হিসাবে ফুটবলারদের প্রস্তুত করা, নিজস্ব ফুটবল বোধ তৈরি করা। ভারত থেকে অনেক প্রস্তাব এসেছে। তবে ওখানে রাতারাতি ফলাফলের প্রত্যাশা করা হয়। যখন ভারতের ক্লাবগুলো দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে কোচিংকে ধরবে, তখনই দেশের ফুটবলের প্রকৃত উন্নতি হবে।”

হৃদয়ের কাছে কলকাতা এবং ইস্টবেঙ্গল

নিজস্ব ফুটবল ভাবনা এবং দর্শন নিয়েই আলেহান্দ্রোর ফুটবলে কলকাতার সবুজ ঘাসে ফুটে উঠত স্প্যানিশ তিকিতাকা। পাসের বিচ্ছুরণে সম্মোহিত হয়ে যেত প্রতিপক্ষ। পেপ গুয়ার্দিওলাকে ‘গুরুদেব’ মানা আলেহান্দ্রো বলছিলেন, “এখন তো ইস্টবেঙ্গলে কোচ রবি ফাউলার। উনি ইউরোপীয় ফুটবলে অনেক বড় নাম। ওঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে ইংলিশ ফুটবলের সঙ্গে স্প্যানিশ স্টাইলের কিন্তু বিস্তর ফারাক। ইংরেজদের ফুটবল অনেক ডিরেক্ট, কন্ট্যাক্ট বেসড। স্প্যানিশ ফুটবল আবার পাসিং নির্ভর। প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব ফুটবল ভাবনা রয়েছে। কোনো স্টাইলই এককভাবে অন্যের থেকে উচ্চতর নয়। ভারতের জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা স্প্যানিশ ধাঁচের ফুটবল আদর্শ। দীর্ঘদিন ধরে এই ফুটবল রপ্ত করলে ইন্ডিয়ার ফিফার ক্রমপর্যায় আরো উন্নত হবে।”

আরো পড়ুন: তারকা বিদেশিকে নিয়ে কর্তা-কোচের মন কষাকষি, চরম ডামাডোল ইস্টবেঙ্গলে

বুরিরামের কোচ থাকার সময়

ফুটবলেই জীবন। তবে অতিমারীর মড়ক চাক্ষুস করেছেন স্পেনেও। একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছেন। মৃত্যুকে সামনে থেকে দেখা আলেহান্দ্রোর গলায় এখনও আতঙ্ক, “আমার পরিবার তো বটেই, গোটা স্পেন জুড়েই ভয়ঙ্কর সংবাদ পাচ্ছিলাম। এখনো সেই শক পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারিনি। আমি মূল শহর নয়, কিছুটা শহরতলির দিকে থাকি। তাই শহরবাসীর মত আমাকে দীর্ঘদিন এপার্টমেন্টে আটকে থাকতে হয়নি। গত কয়েকমাস পরিবারের সঙ্গে দুশ্চিন্তার প্রহর গুনে গিয়েছি কেবল।”

নিজের দেশে আলেহান্দ্রো (ছবি: আলেহান্দ্রো মেনন্দেজ)

সেই অতিমারীর এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তাই ফের ফুটবলের মধ্যেই জীবন খুঁজে নিতে চাইছেন তিনি। চোখ রাখছেন ভারতের ফুটবলে। “ওখানে প্রত্যেক স্প্যানিশ কোচকেই চিনি। কার্লোস কুয়াদ্রাত আমার খুব ভালো বন্ধু। আর এটিকের কোচ আন্তোনিওর সঙ্গে সেল্টা ভিগোর সময় থেকে পরিচয়।” জানান তিনি।

একান্ত জনের সঙ্গে

ডার্বিতে একদিকে প্রিয় বন্ধু হাবাসের এটিকে মোহনবাগান। আর নিজের প্রাক্তন ক্লাব ইস্টবেঙ্গল। কাকে সমর্থন করবেন- এমন প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই স্প্যানিশ দ্রোণাচার্য সাফ জানালেন, “ইস্টবেঙ্গল ছাড়া আর কে! সমর্থকদের কেবল বলতে চাই, স্টেডিয়ামে না থাকলেও প্রিয় দলের ফুটবলার, কোচ, সাপোর্ট স্টাফকে সমর্থন করে যাও। এতে সবাই উদ্দীপ্ত হবে। সমর্থকদের এই ভালোবাসার উত্তাপ মাঠে ফুটবলারদের সেরাটা বের করে আনবে। সমর্থকদের বোঝাতে হবে, ফুটবলারদের জন্য ওঁরা সত্যি গর্বিত।”

Read the full article in ENGLISH

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বাংলা এখন টেলিগ্রামে, পড়তে থাকুন

Get the latest Bengali news and Sports news here. You can also read all the Sports news by following us on Twitter, Facebook and Telegram.

Web Title: Isl 2020 my first derby as coach was my best alejandro menendez recalls his east bengal days

Next Story
মঞ্জরেকরের মুখে কাপড় গুঁজে দেওয়া হয়েছে! বেনজির আক্রমণের মুখে সৌরভ
The moderation of comments is automated and not cleared manually by bengali.indianexpress.com